বন্ধু। জীবনের প্রয়োজনে শব্দটির সাথে সবাই পরিচিত। আর দশটা বিষয়কে শেখাতে প্রয়োজন হয় কত আয়োজনের। কিন্তু বন্ধু আর বন্ধুত্ব শিখাতে প্রয়োজন পড়ে না কোনো আয়োজনের, কোনো পাঠশালার, কোনো কোর্সের। কিন্তু আমরা ভুলে যাই বন্ধুত্ব দুধারি তুলোয়ার, কখনো ভালো বয়ে আনে আবার কখনো মন্দ ডেকে আনে। তাই বন্ধু চিনার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হল।
এতদিন তাদের দুজনের ক্লাস ও সাবজেক্ট ছিল এক এবার প্রথমবার তারা দুটি ভিন্ন সাবজেক্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছে । তবে বন্ধুত্ব আছে আদির মতোই ওটুকু অক্ষয় । বিদ্যালয়টি তাদের বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে অবস্থিত সেখানে যেতে তাদের একটি নদী, একটি পাহাড় এবং কিছু বালকময় স্থান পাড়িতে হয় । চোর এলাকা হওয়ার এদিকে তেমন ভালো কোনো রাস্তা নেই । দুর্গম উঁচা নিচু পথ, কখনো ধুলোয় ধষিত, কখনো বৃষ্টিকাদায় ভেজা । তবুও বাসার ও ফায়াজের তেমন একটা অসুবিধা হয় না । মনের সুখ গল্প করতে করতে হেঁটে হেঁটেই তারা এই পথ পাড়ি দেয় ।
এক বৃষ্টিঝড়া দিনে অন্যদিনগুলোর মতোই তারা দুজন বিদ্যালয়ে যাচ্ছিল । রাতভর অবিরাম বৃষ্টি হয়েছে ভেজা পথ ভালোই লাগছিল । দুটোহীন নির্মল রাস্তা ।
বিভিন্ন বিষয়ে হাসি গল্প করতে করতে তারা পথ চলছিল । অর্থাৎ নিজেদের সাবজেক্টের কিছু সাগত বিষয় তারা তর্কিতরিয়ে পড়ল । বিষয়টি তাদের ছিল ভিন্ন মত ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি । দৃষ্টির এই ভিন্নতা তাদের একটি তুমুল বিতর্কের দিকে ঠেলে দিল । ঝগড়ার এক পর্যায়ে প্রচণ্ড রেগে গেল বাসার । হঠাৎ সে এক চড় বসিয়ে দিল ফায়াজের গালে । ফায়াজ এত কষ্ট পেল । এতে যতটা না ব্যথা পেল কষ্ট পেল তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেল যে, বন্ধু তার গায়ে হাত তুলল । তার যেমন রাগ হলো, অভিমান হলো তার চেয়ে আরো বেশি । কিন্তু মুখে কিছুই বলল না নীরবে পথ চলতে লাগল Fayaz.,
বাসারও চলছে একসঙ্গে । কারও মুখে নেই কোনো কথা, নেই কোনো হাসি, নেই কোনো ঠাট্টা বিদ্রোহ । চলতে চলতে তারা রাস্তার সেই বালোময় স্থানে এসে পৌঁছালো ।
ফয়াজ সেখানে বসে বালুর উপর লেখল, আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আজ আমাকে চড় মেরেছে । এরপর তারা আবার চলতে লাগল আগের মতো নিষ্ঠু নীরব হয়ে । হাঁটতে হাঁটতে এবার তারা সেই নদীর কাছে এসে পৌঁছালো ।
নদীটি খুবই শান্ত এবং গভীর । হেঁটেই পার হওয়া যায় । কিন্তু আজকে আর নদীর সেই চেহারা নেই । রাতভর দীর্ঘ বর্ষণের ফলে নদীর পানি ভরে গেছে । উঁচু থেকে পাহাড়ি ঢল নেমেছে । নদীর দুকূল ছয়ে বয়ে চলছে তীব্র সদয় ধারা । এখানে নদী পাড়ি দিতে হলে সাঁতরাতে হবে । কিন্তু ফয়াজ যে সাঁতার জানে না । তবুও সে বাসারকে কিছু বলল না । বন্ধুর প্রতি তার ভীষণ অভিমান । অন্য দিনগুলোর মতো সাধারণভাবে সeronহৈতে লাগল । ধীরে সামনে যেতে লাগল । যতই অগ্রসর হল পানির গভীরতা ততই বাড়তে লাগল । গভীর পানিতে সে সাঁতরানোর চেষ্টা করল । কিন্তু সে তো সাঁতার জানে না । পরিণামে সে ধীরে ধীরে পানির আরো গভীরে চলে যেতে লাগল । তবুও সে জিতের বশে সামনে যেতে লাগল । ক্রমেই পানি আরো বাড়তে লাগল । অবশেষে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আসলেই ডুবে যেতে লাগল । নদীতে প্রশস্ত স্রোত এবং পানিতে অনেক গভীরতা । সে বুঝে গেল আজ আর তার রক্ষা নেই । পানির প্রবল স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগল । আর কমে সে তলে যেতে থাকল পানির গভীরে ।
এদিকে বাসার হঠাৎ তার বন্ধুর এই অবস্থা দেখে তৎক্ষণাৎ পানিতে ঝাঁপ দিল । অনেক জুড়াজুড়ি ও চেষ্টা তদবির করে বন্ধুটে গভীর জল থেকে টেনে তুলল । পুলে উঠিয়ে বুকে পিঠে চাপ দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে লাগল বাসার । প্যার থেকে কয়েকটুও পানি অবের হল ফয়াজের । কিছুক্ষণ সেখানেই শুয়ে থাকল ফয়াজ । এরপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে । আরো কিছুক্ষণ পর অবস্থা আরো কিছুটা স্বাভাবিক হল । পোশাক পরিচ্ছেদ বদল করল তারা ।
আবারও বিদ্যালয়ের পথে হাঁটা শুরু করল । তবে এখনো তারা নীরব । এভাবে চলতে চলতে তারা যখন পাহাড়ের নিকট এসে পৌঁছল ফয়াজ একটি পাথরের উপর গিয়ে লিখল আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আজ আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে । বাসার তার বন্ধুর এই লেখা দেখে খুবই আশ্চর্য হল । সে ফয়াজকে বলল, আমি তোমাকে চড় মেরেছিলাম । তুমি সেই কথা লিখেছিলে বালুর উপর । আর আমি এখন তোমাকে বাঁচিয়েছি । তুমি সেটা লিখলে পাথরের উপর ।
এমনটা কেন করলে? ফয়াজ বলল, আমরা একে অন্যের বন্ধু তাই আমাদেরকেও যদি কারও প্রতি ভুল করে আমাদের উচিত হবে সেটা ভুলে যাওয়া । ফলে আমি তোমার ভুল করার কথাটি বলছি বা লিখেছি বালুর উপর । যেটি অচিরেই মুছে যাবে পানির ঢেউয়ে । কিন্তু যখন কোনো বন্ধু তার বন্ধুর কোনো ভালো কাজ করে তারা তার উচিত সেটাকে চিরদিন মনে রাখা । এজন্য আমি সেটিকে পাথরের উপর লিখেছি । যাতে সেটা চিরদিন থাকে চিরদিন থাকে মুছে না যায় ।
ফয়াজের এই কথা শুনে বাসার খুবই মুগ্ধ হল । তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেক শুক্রিয়া আদায় করল । এরপর তারা কলেজের দিকে হাঁটতে শুরু করল । আবার শুরু হল কথাবার্তা হাসি ঠাট্টা । তাদের এই অন্তরঙ্গ দেখে কেউ ধারণা করতে পারবে না কিছুক্ষণ আগে তাদের মধ্যে হয়েছিল তুমুল ঝগড়া, কথা কাটাকাটি মারামারির পথে । সুতরাং এই ঘটনা দেখে আমরা বুঝতে পারলাম যখন এক বন্ধু আরেক বন্ধুর রক্ষা করবে বা বাঁচাবে সেটা আমাদের কিচ্ছুতেই মনে রাখতে হবে । আর যখন কোনো ক্ষতি করবে বা রাগারাগি হবে ঝগড়া বিদ্রোহ হবে তখন আমাদেরকে সেটা ভুলে যেতে হবে আবার আগের মতো হয়ে যেতে হবে ।
আমাদের বন্ধুত্ব এমন হওয়ার প্রয়োজন।

No comments:
Post a Comment